আদর্শিক রাষ্ট্র (IDEOLOGICAL STATE)


আদর্শিক রাষ্ট্র (IDEOLOGICAL STATE)

ভূমিকা:

ইসলামী রাষ্ট্র বলতে আমরা কী বুঝি—তার প্রকৃত রূপ, প্রকৃতি, ধরন ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য কী—এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট ও গভীর উত্তর না জানলে ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা অস্পষ্ট থেকে যায়। সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী (রহ.) তাঁর চিন্তায় স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে ইসলামী রাষ্ট্র কোনো প্রচলিত জাতীয় রাষ্ট্র নয়; এটি একটি আদর্শিক রাষ্ট্র (Ideological State)


 আদর্শিক রাষ্ট্রের মৌলিক পরিচয়:

ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি জাতীয়তাবাদভিত্তিক নয়। এখানে জাতি, বংশ, ভাষা কিংবা ভৌগোলিক সীমার নামে কোনো রাষ্ট্রীয় পরিচয় গড়ে ওঠে না। জাতীয়তাবাদের নামগন্ধও ইসলামী রাষ্ট্রের কাঠামোতে অনুপস্থিত। এই বৈশিষ্ট্যই ইসলামী রাষ্ট্রকে পৃথিবীর অন্যান্য সকল রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে স্বতন্ত্র করেছে।

এই রাষ্ট্র নিছক একটি রাজনৈতিক কাঠামো নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শের বহিঃপ্রকাশ। এ কারণেই মওদূদী (রহ.) একে ইংরেজিতে Ideological State নামে অভিহিত করেছেন। ইতিহাসের দীর্ঘ সময় মানুষ বংশ, গোত্র, শ্রেণি কিংবা ভূখণ্ডভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে পরিচিত ছিল। আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা মানুষের চিন্তাজগতে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিল।


 ইসলাম—একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ:

ইসলাম কোনো আংশিক মতবাদ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও চিন্তাকাঠামো। তাই ইসলামের নামে কোনো জাতীয় রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। ইসলামী রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, গোষ্ঠী বা জাতির প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং এটি আদর্শের ভিত্তিতে মানুষের একটি নতুন শ্রেণি গড়ে তোলে।

জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত ফসল হলো জাতীয় রাষ্ট্র। পক্ষান্তরে ইসলাম আদর্শিক রাষ্ট্রের ধারণা বিশ্বজনীনভাবে পেশ করে। এই আদর্শ গ্রহণ করলে মানুষ বর্ণ, গোত্র ও বংশগত বিভাজনের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—একমাত্র ইসলামই এমন আদর্শ, যা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের করে নির্মল আদর্শিক রূপ দিতে সক্ষম।


আধুনিক বিশ্ব ও আদর্শিক রাষ্ট্রের সংকট:

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আদর্শিক রাষ্ট্রের ধারণা প্রায় অপরিচিত। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রব্যবস্থা এই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য (Implications) অনেকের কাছেই অস্পষ্ট।

বিশেষত যারা ইউরোপীয় ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের প্রভাবে শিক্ষিত হয়েছেন, তাদের মানসপটে ইসলামী রাষ্ট্র মানেই একটি জাতীয় রাষ্ট্রের ছবি ভেসে ওঠে। জাতীয় রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা কল্পনা করাই তাদের কাছে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। উপমহাদেশের শিক্ষিত মুসলমান সমাজের একটি বড় অংশও এই সংকীর্ণতায় আক্রান্ত।


 ইসলামী রাষ্ট্র বনাম মুসলিম জাতীয়তাবাদ:

অনেকে মনে করেন—“মুসলমান” নামের একটি জাতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব লাভ করলেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ধারণা মূলত জাতীয়তাবাদী চিন্তারই আরেক রূপ। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তারা অন্যান্য জাতির অনুসৃত পথই অনুসরণ করতে চায়—জাতীয় চেতনা সৃষ্টি, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গঠন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ক্ষমতা দখল ইত্যাদি।

কিন্তু এই পথ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ নয়। ইতিহাস তার প্রমাণ বহন করে। ভাষাভিত্তিক ও জাতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ মুসলমানদের একাধিকবার বিভক্ত করেছে এবং ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে।


গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু ও জাতিগত দাবি।

জাতীয়তাবাদী চিন্তার আলোকে অনেকে মনে করে—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন (Majority Rule) প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার কোটাপদ্ধতি, প্রতিনিধি নির্বাচন ও মন্ত্রিসভায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংরক্ষিত হবে।

এই চিন্তাধারা ইসলামী আদর্শিক রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ ইসলামী রাষ্ট্রে মানুষকে জাতিগত সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয় না; দেখা হয় আদর্শ গ্রহণকারী মানুষ হিসেবে। জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রতিটি অংশ আদর্শিক রাষ্ট্রের জন্য এক একটি ধারালো কুঠারের মতো, যা তার মূল ভিত্তিকে আঘাত করে।


আদর্শিক রাষ্ট্রের মূল আহ্বান।

আদর্শিক রাষ্ট্র যে ধারণা পেশ করে, তার মূল কথা একটাই—মানুষের সামনে ‘জাতি’ বা ‘জাতীয়তাবাদ’ নয়, বরং মানবজাতি। এই রাষ্ট্র মানুষকে এক মহান আদর্শ ও উদ্দেশ্যের দিকে আহ্বান জানায়। এই আদর্শের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠিত হলেই সবার প্রকৃত কল্যাণ ও সাফল্য নিশ্চিত হয়।

এই আদর্শ গ্রহণকারী সকল মানুষ—বর্ণ, ভাষা ও ভূগোল নির্বিশেষে—এই রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান অংশীদার।


উপসংহার:

যে ব্যক্তি বা সমাজ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও জাতিপূজার মোহে আচ্ছন্ন, তাদের পক্ষে এই বিশ্বজনীন আদর্শ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। জাতীয় রাষ্ট্র ও জাতিগত আধিপত্যের জন্য যারা বদ্ধপরিকর, তারা বিশ্ব মানবতার কল্যাণের আহ্বান জানাতে পারে না।

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নয়; বরং মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও কর্মজীবনে আদর্শিক পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমেই এই রাষ্ট্রের ভিত্তি রচিত হতে পারে।

Post a Comment

0 Comments